বারাসাত নামের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ

বারাসাত নামের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ

বারাসাত—কিছু সূত্রে যার উচ্চারণ ‘বারাসত’—এই নামটির উল্লেখ সম্রাট আকবরের শাসনামলে পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, তৎকালীন ভূঁইয়া প্রতাপাদিত্য তাঁর শাসিত অঞ্চলে বিভিন্ন স্থানের নামকরণ করেন। যেমন, কামানের শব্দ থেকে একটি এলাকার নামকরণ হয়েছিল ‘দমদমা’। তবে বারাসাত নামটি কীভাবে প্রচলিত হয়, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

সম্ভবত ‘বারো বসত’ শব্দযুগলের মিলন ও স্বরসামঞ্জস্য থেকেই ‘বারাসত’ নামটির জন্ম। অনুমান করা হয়, সুন্দরবন অঞ্চল বা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ—বর্গী দস্যুদের আতঙ্কে—এই বনজঙ্গলপূর্ণ এলাকায় এসে প্রথমে আনুমানিক ১২টি পরিবার নিয়ে বসতি স্থাপন করেন। কালক্রমে সেই বসতির নামই স্থায়ী হয়ে যায়। লিখিত নথিতে বারাসাত নামটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৬৯ সালে, স্যার উইলিয়াম হান্টারের রচনায়।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে, বারাসাত নামটি তুলনামূলকভাবে নবীন। ১৫৮২ সালে আকবরের সময়ে সমগ্র ২৪ পরগনা অঞ্চল সরকার সাতগাঁর অধীন ছিল এবং মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে তা চাকলা হুগলীর অন্তর্ভুক্ত হয়। সরকার সাতগাঁর অধীনে থাকা ৫৩টি মহলের তালিকায় বারাসাত নামে কোনো পৃথক মহলের উল্লেখ পাওয়া যায় না। সেই সময়ে বর্তমান বারাসাত অঞ্চলটি ছিল আনোয়ারপুর মহলের অন্তর্গত। আনোয়ারপুর থেকে রাজস্ব আদায়ও খুব বেশি ছিল না—আইন-ই-আকবরী অনুযায়ী, সাতগাঁর মোট রাজস্বের মাত্র ১.৪ শতাংশ আসত এই মহল থেকে।

১৮৪৬ থেকে ১৮৫২ সালের মধ্যে ক্যাপ্টেন আর. স্মিথ পরিচালিত জরিপে (যেখানে মোট ৬২টি পরগনার তথ্য সংগ্রহ করা হয়) বারাসাতের নাম আলাদা করে পাওয়া যায় না। তবুও গ্রামাঞ্চলের অংশ হিসেবেই বারাসাত ধীরে ধীরে গুরুত্ব অর্জন করতে থাকে।

জনসংখ্যার দিক থেকে বারাসাত দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিল। ১৮৭২ সালের আগে পর্যন্ত এটি শহরের মর্যাদা পায়নি। প্রথম সরকারি জনগণনা (১৮৭২) অনুযায়ী বারাসাতের জনসংখ্যা ছিল ১১,৮২২ জন। এর আগে ১৮৬৯ সালের পরীক্ষামূলক জনগণনায় জনসংখ্যা ছিল ৯,৬৩৬ জন। স্যার হান্টারের মতে, এই স্বল্প সময়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ ছিল আশপাশের এলাকার অন্তর্ভুক্তি। তুলনামূলকভাবে একই সময়ে বসিরহাটের জনসংখ্যা ছিল ১২,১০৫ জন।

সে সময়ে বারাসাত ছিল একটি মহকুমা শহর। এর আয়তন ছিল ৬.৯০ বর্গমাইল এবং ১৮৬৯ সালে মোট গৃহসংখ্যা ছিল ২,২৬৮টি। ১৮৭২ সালের জনগণনা অনুযায়ী, প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল ১,৭১৪ জন এবং গড়ে প্রতিটি পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিল ৫.২ জন।

একসময় জলাভূমি ও ঘন জঙ্গলে ঘেরা বারাসাত ধীরে ধীরে নগর রূপ লাভ করে। এই রূপান্তরের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। ইংরেজ শাসকদের বসবাস শুরু, ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজদ্দৌলার সেনাবাহিনীর অবস্থান, মিঃ ভ্যানসিটার্ট, মিঃ হেস্টিংস, কর্নেল চ্যাম্পিয়ান ও মিঃ ডাক-এর সময়ে ১৭৮৩ সালে ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা, ১৮০২ সালে মিলিটারি কলেজ স্থাপন এবং ১৮২৩ সালে বারাসাতকে সদর শহর হিসেবে ঘোষণা—এই সবই নগরায়ণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

এছাড়াও শিক্ষা ও চিকিৎসা পরিকাঠামো, সড়ক নির্মাণ (১৮৩৩ সালে টাকী রোড, বর্তমান কালীনাথ মুন্সী রোড), সরকারি বিদ্যালয়, ১৭৮০ সালে ঘোড়দৌড়ের মাঠ, ১৭৬৪–৬৮ সালের মধ্যে বিবির হাটসহ বিভিন্ন হাট-বাজার বারাসাতের বিকাশে বড় ভূমিকা নেয়। পানীয় জলের জন্য ১৬১৪ সালে মধুমুরলী পুকুর খনন করা হয়। ১৭৫৬ সালে সিরাজদ্দৌলার হাতিদের জলপানের জন্য খোঁড়া হয় ‘হাতিপুকুর’।

বাণিজ্যিক দিক থেকেও বারাসাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৭৬৯ সালে মিঃ জন প্রিন্সেপ এখানে নীলচাষ শুরু করেন, যার আওতায় আসে ৮৪টি গ্রাম। এই নীলচাষ ও রপ্তানিমুখী ব্যবসা প্রায় একশ বছর ধরে চলেছিল। ধারণা করা হয়, ‘নীলগঞ্জ রোড’ নামটিও এই নীলচাষ কেন্দ্র থেকেই এসেছে। উর্বর কৃষিজমি, জলাশয় খনন এবং খালের মাধ্যমে বর্জ্য নিষ্কাশনের মতো পরিকাঠামো তখন গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৯ সালে তৎকালীন বারাসাতের ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ অ্যাসলি ইডেন বাধ্যতামূলকভাবে নীলচাষ বন্ধের নির্দেশ দেন। এর আগে ১৮৫৮ সালে দীনবন্ধু মিত্রের ঐতিহাসিক নাটক নীলদর্পণ জনমনে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।

১৮৬৯ থেকে ১৮৭২ সালের মধ্যে বারাসাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হয় এবং আশপাশের বহু এলাকার জনসংখ্যা এতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মধ্যেই ১৮৬১ সালে বারাসাত জেলার মর্যাদা বাতিল করা হয়। যদিও এটি আর জেলার সদর শহর ছিল না, তবুও বিদ্যমান পরিকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে মহকুমা প্রশাসনিক দপ্তর চালু থাকে। উল্লেখযোগ্য যে, ১৮৩৪ থেকে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত বারাসাত জেলার মর্যাদাও ভোগ করেছিল।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বারাসাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৮৪৩ সালে আচার্য প্যারীচরণ সরকার, ১৮৪৮ সালে কালীকৃষ্ণ দত্ত, ১৮৫৭ সালে রামতনু লাহিড়ী, কবিয়াল মহেশ কানার, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৬), ভগীরথ চট্টোপাধ্যায় (১৯২১), সুভাষচন্দ্র বসু (১৯৩৯) সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এখানে শিক্ষা, দেশপ্রেম, সঙ্গীত-নাটক ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁদের কর্মকাণ্ড শুধু বারাসাত নয়, সমগ্র পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকেও সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *